যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

United Nations accuses US and Iran of crimes against humanity
অনলাইন ডেস্ক ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৬ অপরাহ্ন বিশ্ব/আন্তর্জাতিক
অনলাইন ডেস্ক ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৬ অপরাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
--সংগৃহীত ছবি

ইরানে দুটি সামরিক হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক কারণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল। একইসঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বলেও জানিয়েছে তারা।

রয়টার্স বলছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান মিশন এসব তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনটি জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপন করা হবে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা এবং গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভে ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া—দুই বিষয়ই তদন্ত করেছে মিশন। এ বিষয়ে জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী মিশন তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের কাছে কোনো মন্তব্য করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, তাদের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ইরান ধারাবাহিকভাবে দেশটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারেহ তায়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দায়ী বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক কারণ তারা পেয়েছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। তাদের মধ্যে ১২০ জন ছিল স্কুলশিক্ষার্থী।

জাতিসংঘ মিশনের ভাষ্য—হামলাটি ছিল নির্বিচার আক্রমণ, যাতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে—ওই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র এমন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল যেখানে দাবি করা হয়েছিল, ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে হামলা চালানোর আগে তথ্যটি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।

তদন্তকারীরা বলেন, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য হালনাগাদ না করা এবং স্থাপনাটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল কি না তা নিশ্চিত না করা শুধু অবহেলার পর্যায়ে পড়ে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যেখানে বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার বড় ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে তারা অবগত ছিল।’

গত জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের একটি মেয়েদের স্কুলে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা করেনি। তিনি এ বিষয়ে তদন্তের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে প্রাণঘাতী হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল। তবে পেন্টাগন পরে তদন্তের পরিধি বাড়ালেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাথমিক ফল প্রকাশ করেনি।

জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছেন, স্কুলটি স্পষ্টভাবে বেসামরিক স্থাপনা ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল—এমন কোনো প্রমাণ তারা পাননি।

ইরানের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় ফারস প্রদেশের লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়াকেন্দ্রে হামলার বিষয়েও একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে জাতিসংঘ মিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই হামলায় আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হন। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা এটিকেও নির্বিচার হামলা হিসেবে উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে বলে জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মার্চে এক বিবৃতিতে বলেছিল, ওই দিনে তাদের বাহিনী লামের্দ শহরে কোনো হামলা চালায়নি।

জাতিসংঘের তদন্তে বলা হয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক গুম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় দমন অভিযানে নিহতদের মধ্যে সাধারণ পথচারীরাও ছিলেন।

তবে তেহরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে—নির্বাসিত বিরোধী গোষ্ঠী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাকারীরা’ এসব অস্থিরতার পেছনে ছিল। জাতিসংঘ মিশন বলেছে, তারা স্বাধীনভাবে নিহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। তবে তাদের ধারণা, প্রকৃত হতাহত সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। ইরানের সরকারি হিসাবে বিক্ষোভ দমনে ৩ হাজার ৩৮ জন নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ মোকাবিলায় ইরান সরকারের পদক্ষেপ—যার মধ্যে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার ছিল—আগের মতো ভিন্নমত দমনের পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কঠোরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।